Gulfzi Header - Redesign

প্রথম শিফট

রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে গেল সুমনের, যদিও অ্যালার্ম দেওয়া ছিল পাঁচটায়। বুকের ভেতর একটা অস্থিরতা, ঘুম যেন আর ফিরবে না। ক্যাম্পের রুমে বাকি সাতজন তখনও ঘুমে, কারো নাক ডাকার শব্দ, কারো ফ্যানের বাতাসে চাদর উড়ছে। সুমন উঠে বসল অন্ধকারে, মোবাইলের আলোয় মায়ের একটা পুরনো মেসেজ পড়ল আরেকবার — “বাবা, নিজের যত্ন নিস, শরীর ঠিক রাখিস।” মেসেজটা তিন সপ্তাহ আগের, দেশ ছাড়ার দিন পাঠানো।

জেদ্দার একটা কনস্ট্রাকশন সাইটে সকাল ছয়টায় পৌঁছাল সে। এসি বাসের ঠান্ডা থেকে নেমেই গরম বাতাসের একটা ধাক্কা লাগল শরীরে, যদিও সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি। বুকটা ধুকপুক করছিল। দেশে সে ছোটখাটো ইলেকট্রিক্যাল কাজ করত, বাড়ির ওয়্যারিং, ফ্যান লাগানো, সুইচবোর্ড ঠিক করা — কিন্তু এখানে সব অন্যরকম। বিশাল সাইট, ক্রেনের শব্দ, হাজার হাজার তার আর প্যানেল, আর সবচেয়ে বড় কথা — ভাষা বোঝে না। শুধু কিছু আরবি শব্দ শিখেছে জাহাজে বসে, ইউটিউব ভিডিও দেখে দেখে, রাতের পর রাত।

সুপারভাইজার একজন মিশরীয় লোক, নাম আবু ইউসুফ। মোটা গলার স্বর, চোখে সবসময় একটা কড়া দৃষ্টি। ইংরেজি-আরবি মিশিয়ে কথা বলে, দ্রুত, অনেকটা যেন ধরে নিয়েছে সবাই সব বুঝে যাবে। প্রথম নির্দেশটাই বুঝতে পারল না সুমন — “কেবল ট্রে” বলতে কী বোঝাচ্ছে, কোথায় খুঁজবে, কীভাবে বহন করবে — কিছুই স্পষ্ট হলো না। এদিক-ওদিক তাকিয়ে অন্যদের অনুসরণ করার চেষ্টা করল, লজ্জায় মুখ লাল হয়ে উঠছিল। দশ মিনিট লেগে গেল জিনিসটা খুঁজে পেতে, ততক্ষণে রোদের তাপ চল্লিশ ছুঁয়ে ফেলেছে। হেলমেটের ভেতর ঘামে ভিজে যাচ্ছিল মাথা, পিঠ দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল শার্টের ভেতর দিয়ে।

দুপুরের দিকে একটা ভুল হয়ে গেল — তাড়াহুড়োয় ভুল সাইজের তার লাগিয়ে ফেলল একটা প্যানেলে। আবু ইউসুফ চিৎকার করে উঠল, বাকি সব শ্রমিকের সামনেই, হাত নেড়ে নেড়ে, স্বরে বিরক্তি আর রাগ মেশানো। সুমনের কানের কাছে গরম রক্ত উঠে এলো, লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ ভিজে আসতে চাইছিল কিন্তু জোর করে আটকে রাখল। মনে হলো, এই দেশে আসাটাই বুঝি ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। মনে পড়ল দেশে থাকা মায়ের মুখ, ছোট বোনের বিয়ের জন্য জমানো টাকার হিসাব, বাবার ঋণ শোধের প্ল্যান — সব যেন একসাথে বুকে চেপে বসল।

লাঞ্চ ব্রেকে একলা বসে শুকনো রুটি চিবাচ্ছিল, গলা দিয়ে নামছিল না ঠিকমতো। তখন পাশে এসে বসল রফিক, বয়সে বড়, তিন বছর ধরে এই সাইটেই কাজ করছে। কিছু না বলে প্রথমে একটা পানির বোতল এগিয়ে দিল, তারপর নিজের টিফিন থেকে একটু ডাল দিল সুমনের প্লেটে।

“প্রথম দিন সবার এমনই হয় ভাই,” বলল রফিক, হালকা হেসে। “আমিও প্রথম মাসে দুইবার লুকিয়ে কান্না করছি, বাথরুমে গিয়ে। কেউ দেখে নাই, কাউরে বলিও নাই।” হেসে বলল কথাটা, কিন্তু চোখের ভেতর একটা সত্যতা ছিল, যা মিথ্যা সান্ত্বনা নয়।

সুমন কিছু বলল না, শুধু মাথা নাড়ল। কিন্তু বুকের ভেতর কিছু একটা হালকা হলো — সে একা নয় এই কষ্টে, এর আগেও হাজারো মানুষ একই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে।

বিকেলের দিকে আবু ইউসুফ আবার এলো তার কাছে, এবার গলার স্বর আগের চেয়ে নরম। হাতে ধরে দেখিয়ে দিল কালার কোডিং কীভাবে পড়তে হয়, কোন তার কোথায় লাগাতে হয়, কীভাবে চেক করতে হয় সংযোগ ঠিক আছে কিনা। “তুমি শিখবে,” বলল ভাঙা ইংরেজিতে, কাঁধে হালকা চাপড় দিয়ে, “সবাই শিখেছে। আমিও একদিন নতুন ছিলাম।”

সেই ছোট্ট কথাটুকু, সেই কাঁধে হাতের স্পর্শটুকু, সারাদিনের ক্লান্তি আর অপমানের ভেতর থেকে যেন একটুখানি আলো এনে দিল।

সন্ধ্যায় শিফট শেষে ক্যাম্পে ফিরে গোসল করে বিছানায় শুয়ে সুমনের শরীর ভেঙে আসছিল ব্যথায়। হাতে ফোসকা পড়েছে, পিঠে ব্যথা, চোখ জ্বালা করছে রোদে। মোবাইলে মায়ের নম্বরটা বের করল, কল দেওয়ার আগে কয়েকবার থেমে গেল। কী বলবে? কাজ কঠিন, সুপারভাইজার বকেছে, ভুল করেছে, কান্না পাচ্ছিল — এসব শুনলে মা রাতে ঘুমাতে পারবে না।

তাই ফোন না করে শুধু একটা মেসেজ লিখল, আঙুল কাঁপছিল একটু — “মা, ভালো আছি। কাজ কঠিন কিন্তু পারব।”

মেসেজটা পাঠিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ শুয়ে রইল সুমন, চোখের কোণ ভিজে উঠল নিঃশব্দে। ভাবল — আজকের দিনটা যতটা কঠিন গেছে, কালকেরটা হয়তো একটু কম কঠিন হবে। এভাবেই তো সবাই শেখে, একটা একটা করে ভুল, একটা একটা করে অপমান, একটা একটা করে ছোট্ট সাহায্যের হাত পেরিয়ে।

ঘুমিয়ে পড়ার আগে শেষ যে চিন্তাটা মাথায় এলো, সেটা ছিল — কালকে সকালেও উঠতে হবে, আবার যেতে হবে সেই একই সাইটে। কিন্তু আজ রাতে অন্তত এইটুকু জানে, সে একা নয়।

আপনিও কি সৌদি আরবে নতুন? প্রথম ৩০ দিনে কীভাবে মানিয়ে নেবেন জানতে পড়ুন সৌদিতে নতুন প্রবাসীর অভিযোজন গাইড। ইলেকট্রিক্যাল কাজে দক্ষতা বাড়িয়ে ভালো বেতনের চাকরি পেতে দেখুন ইলেকট্রিশিয়ান ক্যারিয়ার গাইড, আর নতুন চাকরি খুঁজতে সাহায্য নিন সৌদিতে চাকরি খোঁজার সম্পূর্ণ গাইড থেকে।

এই লেখাটি কি সহায়ক হয়েছে?
Scroll to Top