Gulfzi Header - Redesign

মেয়ের জন্মদিন

সকাল থেকেই হাসিমের মনটা কেমন অস্থির ছিল। ফোনে ক্যালেন্ডারে লাল দাগ দেওয়া তারিখটা বারবার চোখে পড়ছিল — আজ তার মেয়ের সাত বছর পূর্ণ হবে। দাম্মামের একটা ছোট রুমে বসে সে গুনছিল, ঠিক সাত বছর আগে এই দিনে হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে সে প্রথম শুনেছিল মেয়ের কান্নার আওয়াজ। সেই মুহূর্তটা এখনো তার চোখে জ্বলজ্বল করে, যদিও মাঝখানে চার বছর ধরে সে দেশে নেই।

বিকেলে কাজ থেকে ফিরে গোসল সেরে বিছানায় বসে মোবাইল হাতে নিল হাসিম। বউয়ের নম্বরে ভিডিও কল দিল, বুকের ভেতর একটা উত্তেজনা আর ভয় মিশে ছিল একসাথে — মেয়ে কি তাকে চিনতে পারবে ঠিকমতো ভিডিওতে? স্ক্রিনে যখন মেয়ের মুখটা ভেসে উঠল, ছোট্ট হাতে একটা কাগজের মুকুট পরা, চোখে ঝিলিক, হাসিম নিজের চোখ সরাতে পারল না। এত সুন্দর লাগছিল তাকে।

ঘরের মধ্যে ছোট্ট একটা কেক, কয়েকটা বেলুন, প্রতিবেশীর দুই-একটা বাচ্চা। কেক কাটার সময় বউ মোবাইলটা এমনভাবে ধরে রাখল, যাতে বাবাও দেখতে পারে সবটুকু। জন্মদিনের গান গাওয়া হলো, সবাই হাততালি দিল, মেয়ে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভাল, আর হাসিম শত মাইল দূরে বসে একটা ছোট্ট স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে সবটুকু দেখল, নিজের হাতে কেক ছোঁয়ার সৌভাগ্য ছাড়াই।

বাবা, তুমি কবে আসবা? — মেয়ে জিজ্ঞেস করল কেক কাটার পরপরই, মুখে ক্রিম লেগে আছে, চোখে সরল একটা প্রশ্ন যেটার উত্তর হাসিমের কাছে নেই।

হাসিম রুমে বসে ছিল একা তখন, বাকি রুমমেটরা কাজে গেছে নাইট শিফটে। জানালার বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে, দূরে কোথাও একটা কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। সামনের ঈদে আসব, মা — বলল সে, গলাটা যতটা সম্ভব হালকা রাখার চেষ্টা করে, যদিও ভেতরে ভেতরে জানে টিকিটের টাকা এখনো পুরোপুরি জোগাড় হয়নি, আর ছুটি পাওয়াও নিশ্চিত না।

মেয়ে খুশি হয়ে হাততালি দিল, সত্যি বাবা? তাহলে আমি তোমার জন্য একটা ছবি আঁকব, স্কুলে শিখেছি নতুন। হাসিম হাসল, মাথা নাড়ল, কিন্তু বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছিল। এই মিথ্যা-না-মিথ্যা প্রতিশ্রুতিগুলো সে কতবার দিয়েছে, আর কতবার ভেঙেছে, তার হিসাব নেই।

কল কেটে যাওয়ার পর ঘরটা হঠাৎ বেশি নিস্তব্ধ মনে হলো। দেয়ালে ঝোলানো মেয়ের একটা পুরনো ছবি — তিন বছর বয়সের, যখন হাসিম শেষবার দেশে ছিল। এখন মেয়ে সেই ছবির চেয়ে অনেক বড়, অনেক বদলে গেছে, আর হাসিম প্রতিটা পরিবর্তন মিস করে গেছে একটা একটা করে — প্রথম স্কুলে যাওয়া, প্রথম দাঁত পড়া, প্রথম সাইকেল চালানো, প্রথম বাংলা অক্ষর লেখা। প্রতিটা মুহূর্তের একটা ছবি বা ভিডিও ক্লিপ এসেছে মোবাইলে, কিন্তু সরাসরি দেখার সুযোগ কখনো হয়নি।

রাতে কাজে গিয়ে হাসিম চুপচাপ কাজ করে গেল, স্বাভাবিকের চেয়ে ধীরে, মনটা যেন অন্য কোথাও পড়ে আছে। সুপারভাইজার খেয়াল করল কিছু একটা ঠিক নেই, কাছে এসে জিজ্ঞেস করল। হাসিম শুধু বলল, কিছু না ভাই। এখানে সবার গল্প প্রায় একইরকম — সন্তানের জন্মদিন মিস করা, স্ত্রীর অসুস্থতায় পাশে থাকতে না পারা, বাবা-মায়ের বয়স বাড়তে দেখা শুধু ফোনের স্ক্রিনে — কেউ বলে না এসব, সবাই নিজের ভেতরে বহন করে চুপচাপ।

মাস শেষে বেতন হাতে পেয়ে প্রথমে বাড়িতে টাকা পাঠাল হাসিম, সংসারের খরচ, মেয়ের স্কুলের বেতন। তারপর বাকি অল্প কিছু টাকা আলাদা করে জমাতে শুরু করল টিকিটের জন্য, একটা ছোট্ট খামে। প্রতিদিন কাজ শেষে সেই খামটা বের করে গুনত, প্রতিদিন একটু একটু করে জমছে দেখে মনে একটা আশা জাগত। ক্যালেন্ডারে দাগ কেটে রাখছিল দিন গোনার মতো, ঈদের তারিখ পর্যন্ত কতদিন বাকি।

একদিন রাতে ভিডিও কলে মেয়ে হঠাৎ বলল, বাবা, তুমি না থাকলেও আমি জানি তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো। আম্মু বলছে তুমি অনেক কষ্ট করে টাকা পাঠাও, রোদে কাজ করো, তাই আমাদের ঘর চলে। কথাগুলো নিষ্পাপ গলায় বলল মেয়ে, নিজের মতো করে, স্কুল থেকে শিখে আসা কোনো বাক্য হয়তো, কিন্তু হাসিমের বুকে গিয়ে লাগল যেন সরাসরি হৃদয়ে।

হাসিম কিছু বলতে পারল না প্রথমে, শুধু হাসল, চোখ ভিজে আসছিল দ্রুত। মোবাইলের স্ক্রিনে মেয়ের মুখ ঝাপসা হয়ে আসছিল চোখের পানিতে। মা রে, বলল অবশেষে, গলা কাঁপছিল, তুমি অনেক বুঝদার হয়ে গেছ।

এই একটা কথাই যেন সব ক্লান্তি, সব একাকীত্ব, সব দূরত্বের কষ্ট কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দিল। দূরত্ব কমেনি, রাস্তা এখনও লম্বা, ঈদ আসতে এখনও অনেকদিন বাকি — কিন্তু বুকের ভেতর একটা জায়গা হালকা হলো সেই রাতে, যেন মেয়ের ছোট্ট একটা কথা তাকে মনে করিয়ে দিল, এই কষ্টের পেছনে একটা কারণ আছে, একটা ভালোবাসা আছে যেটা কোনো দূরত্বেই ফিকে হয় না।

কল শেষ হওয়ার পর হাসিম অনেকক্ষণ বসে রইল অন্ধকার ঘরে, খামটা হাতে নিয়ে আরেকবার গুনল টাকাগুলো। মনে মনে ঠিক করল, যত কষ্টই হোক, এবার ঈদে সে যাবেই। মেয়ের কাছে ফিরে গিয়ে প্রথম যে কাজটা করবে, সেটা হলো মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরা, আর বলা — এই যে এতদিনের দূরত্ব, এটা কখনো তার ভালোবাসাকে কমাতে পারেনি, বরং প্রতিদিন আরও গভীর করেছে।

পরিবারের কাছে সবচেয়ে বেশি টাকা পাঠাতে সেরা রেট ও সার্ভিস বেছে নিতে দেখুন সৌদি থেকে বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর গাইড। পরিবারকে সৌদি আরবে বেড়াতে আনতে চাইলে পড়ুন ফ্যামিলি ভিজিট ভিসা গাইড

এই লেখাটি কি সহায়ক হয়েছে?
Scroll to Top