Gulfzi Header - Redesign

দালালের ফাঁদ

জসিম যেদিন দালালকে শেষ কিস্তির টাকাটা দিল, সেদিন রাতে বাড়িতে একটা ছোট্ট দোয়া মাহফিল হয়েছিল। প্রতিবেশীরা এসেছিল, মিষ্টি বিতরণ হয়েছিল, মা চোখের পানি মুছতে মুছতে সবাইকে বলছিলেন, “আমার ছেলে সৌদি যাচ্ছে, ভালো কোম্পানিতে চাকরি, ক্লিনার পদে, বেতন পনেরোশ রিয়াল।” আড়াই লাখ টাকা — জমি বন্ধক রেখে, বোনের গয়না বিক্রি করে জোগাড় হয়েছিল সেই টাকা। সবার চোখে তখন স্বপ্ন, জসিমের চোখেও।

বিমানবন্দরে নেমে যে লোকটা তাকে নিতে এলো, তার হাতে একটা কাগজ, কিন্তু কোম্পানির নামটা অচেনা। জসিম কয়েকবার পড়ল কাগজটা, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। “ভাই, এইটা তো আমার কোম্পানির নাম না,” বলল সে, গলা কাঁপছিল।

লোকটা কাঁধ ঝাঁকাল, যেন এটা কোনো ব্যাপারই না। “ফ্রি ভিসা। নিজে কাজ খুঁজে নিতে হবে। প্রতি মাসে কফিলকে টাকা দিবা, ইকামা রাখার জন্য।” এতটুকু বলেই লোকটা চলে গেল, জসিমকে একটা অচেনা শহরে, অচেনা মানুষদের মাঝে একা রেখে।

প্রথম রাতে আটজনের একটা ছোট রুমে থাকতে দেওয়া হলো তাকে। মেঝেতে পাতলা তোশক, দেয়ালে স্যাঁতস্যাঁতে দাগ, বাতাসে বাসি রান্নার গন্ধ। জসিম শুয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল — এই কি সেই স্বপ্নের সৌদি আরব, যার জন্য সে পরিবারের সব সঞ্চয় বাজি ধরেছে?

প্রথম দুই সপ্তাহ কোনো কাজ পেল না। প্রতিদিন সকালে বের হতো, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, দোকানে দোকানে জিজ্ঞেস করত কাজ আছে কিনা। ভাষা বোঝে না, তাই বেশিরভাগ জায়গায় হাত-ইশারায় কথা বলার চেষ্টা করত। খাবারের টাকা ফুরিয়ে আসছিল দ্রুত। একদিন সন্ধ্যায় মায়ের ফোন এলো, স্বরে খুশি — “বাবা, কেমন আছিস, কাজ কেমন চলছে?”

জসিম গলা ঠিক রেখে বলল, “ভালো আছি মা, কাজ শুরু হয়ে গেছে। বেতন পেলে টাকা পাঠাব।” ফোন রাখার পর দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল, পেটে তখন তীব্র ক্ষিদে, চোখে পানি। মিথ্যা বলাটা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, কিন্তু সত্যিটা বললে মা যে ভেঙে পড়বেন, সেটা সহ্য করার মতো শক্তি জসিমের ছিল না।

তৃতীয় সপ্তাহে রুমমেট একজন, নাম আলমগীর, তাকে নিয়ে গেল একটা বাংলাদেশি কমিউনিটি গ্রুপের সাপ্তাহিক জমায়েতে, যেখানে পুরনো প্রবাসীরা নতুনদের সাহায্য করে। সেখানে বসে জসিম প্রথমবার নিজের গল্পটা খুলে বলল, আর অবাক হয়ে দেখল, তার মতো আরও অনেকেই একই ফাঁদে পড়েছে। একজন বয়স্ক মানুষ তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তুমি একা না বাবা। এইখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা আছে, ধৈর্য ধরো।” সেখান থেকেই জানল, একটা লেবার অফিসে গিয়ে ফ্রড ভিসার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায়, আর বাংলাদেশ দূতাবাসেও যোগাযোগ করা যায় সাহায্যের জন্য।

পরদিন সকালে দূতাবাসের সামনে লাইনে দাঁড়াল জসিম, হাতে ধরা কাগজপত্র ঘামে ভিজে যাচ্ছিল। সারাদিন অপেক্ষার পর যখন তার পালা এলো, কর্মকর্তা প্রথমে বিরক্ত ভাব দেখালেন, তাড়াহুড়োর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন কাগজপত্র। কিন্তু বিস্তারিত শুনে, কাগজ দেখে, তার মুখটা নরম হয়ে এলো। “এই রকম কেসে আমরা আগেও সাহায্য করেছি। ঘাবড়িও না, আমরা দেখছি।” সেই কথাটুকু শুনে জসিমের চোখ দিয়ে হঠাৎ পানি গড়িয়ে পড়ল — এতদিন পর কেউ একজন বলল, তার পাশে আছে।

কফিল বদলের প্রসেস শুরু হলো, কিন্তু সময় লাগল প্রায় দুই মাস। এই দুই মাস জসিম একটা রেস্টুরেন্টে আন্ডার-দ্য-টেবিল কাজ করেছে বাসন ধোয়ার, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে হাত ফুলে যেত, পিঠে ব্যথা হতো অসহ্য। যা পেত তা দিয়ে কোনোমতে দিন চলত, বাড়িতে টাকা পাঠানোর প্রশ্নই আসত না। রাতে ক্লান্ত শরীরে শুয়ে ভাবত, দেশে ফিরে যাবে কিনা। কিন্তু ঋণের বোঝা, পরিবারের আশা, প্রতিবেশীদের সামনে মুখ দেখানোর ভয় — ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না তার। একদিন রাতে ফোনে বোনের গলা শুনে বুক ফেটে কান্না এলো — বোনের গয়না বিক্রি করা টাকায় সে এখানে এসেছে, অথচ এখনো কিছুই ফেরত দিতে পারেনি।

প্রায় দুই মাস পর, এক বিকেলে, দূতাবাস থেকে ফোন এলো — কাগজপত্র রেডি, নতুন ইকামা হাতে পাওয়া যাবে সপ্তাহখানেকের মধ্যে। জসিম ফোনটা কানে ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদল, লজ্জা না পেয়ে, যেন এতদিনের সব ভার একসাথে নেমে গেল বুক থেকে।

নতুন ইকামা হাতে পেয়ে বৈধ একটা কোম্পানিতে কাজ শুরু হলো, পরিষ্কার ইউনিফর্ম, নির্দিষ্ট বেতন, নির্দিষ্ট কাজের সময়। প্রথম বেতন হাতে পেয়ে জসিম কাঁদল আবার, কিন্তু এবার কষ্টে না, একটা অদ্ভুত স্বস্তিতে। সেই রাতে দেশে ফোন করে প্রথমবার সত্যি কথা বলল মাকে — কী কী হয়েছিল এতদিন, কতটা কষ্ট করতে হয়েছে, কীভাবে দূতাবাসের সাহায্যে সব ঠিক হলো।

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ফোনের ওপাশে, তারপর ধরা গলায় বললেন, “বাবা, শরীরের যত্ন নিস। টাকার চেয়ে তুই বড়। এতদিন কেন বলিস নাই আমাকে?” জসিম উত্তর দিতে পারল না, শুধু ফোন কানে ধরে চুপচাপ কেঁদে গেল, মায়ের কণ্ঠের প্রতিটা শব্দ বুকে গেঁথে নিতে নিতে।

আজ জসিম নতুন কোম্পানিতে স্থিতিশীল একটা জীবন কাটাচ্ছে, প্রতি মাসে টাকা পাঠায় বাড়িতে, বোনের গয়নার দেনা শোধ করেছে সম্পূর্ণ। আর যখনই নতুন কোনো ছেলে দেশ থেকে আসার কথা শোনে, নিজে থেকে যোগাযোগ করে, সাবধান করে দেয় — ভিসার কাগজ ভালো করে যাচাই না করে, কোম্পানির নাম নিশ্চিত না হয়ে কারো কথায় বিশ্বাস না করতে। কারণ সে জানে, এই সাবধানবাণীটুকু হয়তো কারো জীবনের আড়াই লাখ টাকা আর দুই মাসের কষ্ট বাঁচিয়ে দিতে পারে।

আপনি কি একই রকম প্রতারণার শিকার হয়েছেন বা ভিসার বৈধতা নিয়ে সন্দিহান? জেনে নিন আপনার অধিকার সৌদি আরবের শ্রম আইন গাইড থেকে, নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া চাকরি বদলের নতুন নিয়ম জানুন কাফালা সংস্কার গাইডে, আর জরুরি সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করুন বাংলাদেশ দূতাবাসের সেবা গাইড অনুযায়ী।

এই লেখাটি কি সহায়ক হয়েছে?
Scroll to Top