Gulfzi Header - Redesign

বাবার জানাজায় দাঁড়াতে পারিনি — এক প্রবাসীর সবচেয়ে কষ্টের রাত।

রাত পৌনে তিনটা। ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ। স্ক্রিনে ভেসে উঠল “বড় ভাই”। এত রাতে ভাইয়ের ফোন মানেই বুক ধক করে ওঠে — প্রবাসে থাকা প্রতিটা মানুষ এই ভয়টা চেনে।

“হ্যালো ভাই, কী হয়েছে?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ভাঙা গলায় একটা কথা — “বাবা আর নেই।”

আমি নাম বলছি না, কারণ এই গল্পটা শুধু একজনের না। জেদ্দা, দাম্মাম, রিয়াদ, খামিস মুশাইত — সৌদি আরবের প্রতিটা শহরে এমন একটা রাত অন্তত একজন বাংলাদেশি ভাইয়ের জীবনে এসেছে।

ফোনটা কানে ধরে বসেছিলাম মেঝেতে। কোম্পানির রুমে তখন সবাই ঘুমে। বাইরে বের হয়ে করিডোরে দাঁড়ালাম, যেন কান্নার শব্দটা কারো ঘুম না ভাঙায়। কিন্তু কান্না আসছিলই না প্রথমে — শুধু একটা শূন্যতা, যেন বুকের ভেতর কেউ সব খালি করে দিয়েছে।

বাবা অসুস্থ ছিলেন কয়েক মাস ধরে। কিডনির সমস্যা। প্রতি মাসে বেতনের একটা বড় অংশ পাঠাতাম ওষুধ আর ডায়ালিসিসের জন্য। ভাবতাম, আরেকটু টাকা জমুক, তারপর ছুটি নিয়ে দেশে যাব, বাবার পাশে বসে থাকব কিছুদিন। কিন্তু ভিসার রেসিডেন্সি পিরিয়ড তখনো শেষ হয়নি, exit re-entry নিতে গেলে কফিলের অনুমতি লাগবে, আর হুট করে ছুটি চাইলে চাকরি নিয়েও একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয় — এই হিসাবগুলো মাথায় ঘুরছিল যখন বাবা শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন হাজার হাজার মাইল দূরে, একটা সরকারি হাসপাতালের বেডে।

জানাজার সময় বাংলাদেশে তখন সকাল। আমি ভিডিও কলে যুক্ত হলাম। ভাই ফোনটা এমনভাবে ধরে রেখেছিল যাতে আমি জানাজায় “দাঁড়াতে” পারি — একটা ছোট্ট মোবাইল স্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে। ইমাম সাহেবের কথাগুলো নেটওয়ার্কের সমস্যায় ভেঙে ভেঙে আসছিল। আমি কফিনটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না, শুধু বুঝতে পারছিলাম মানুষগুলো সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি একা দাঁড়িয়েছিলাম ক্যাম্পের ছাদে, মোবাইল বুকের কাছে ধরে, নামাজের নিয়ম জানি না বলে শুধু চুপ করে চোখ বন্ধ করে রইলাম।

জানাজা শেষ হওয়ার পর ফোনটা কেটে গেল। নেটওয়ার্ক চলে গিয়েছিল, নাকি আমিই কেটে দিয়েছিলাম মনে নেই। ছাদে একা দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। ফজরের আজান দিচ্ছিল আশেপাশের মসজিদগুলো থেকে। আকাশ তখন হালকা নীল হতে শুরু করেছে। আমি ভাবছিলাম, বাবা সারাজীবন যে ছেলেকে মানুষ করার জন্য নিজে না খেয়ে থেকেছেন, সেই ছেলে তার শেষ বিদায়েও পাশে দাঁড়াতে পারল না।

এরপর কয়েকদিন কাজে যাইনি, যেতে পারিনি। সুপারভাইজার জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে। বললাম, বাবা মারা গেছেন। তিনি শুধু মাথা নাড়লেন, বললেন “আফওয়ান” (দুঃখিত), আর কাজে ফিরতে বললেন যত দ্রুত সম্ভব। প্রবাসে শোক করারও একটা সময়সীমা থাকে — বেতন কাটা যায়, প্রজেক্টের ডেডলাইন থেমে থাকে না।

তিন মাস পর যখন প্রথম ছুটিতে দেশে গেলাম, সোজা কবরস্থানে গিয়েছিলাম। মাটির উপর বসে বাবাকে প্রথমবার “সালাম” জানালাম, যা জীবিত অবস্থায় শেষবার ফোনেই বলতে পেরেছিলাম। কবরের পাশে বসে বুঝলাম, এই কষ্টটা কোনোদিন পুরোপুরি যাবে না। শুধু সয়ে যেতে শিখতে হয়।

আজ যখন নতুন কোনো ভাই কান্নাজড়িত গলায় বলে, “বাবা অসুস্থ, দেশে যেতে পারছি না,” আমি চুপ করে শুনি। সান্ত্বনার কোনো কথা খুঁজে পাই না, কারণ জানি — এই কষ্টের কোনো সহজ সান্ত্বনা হয় না। শুধু বলি, “ফোনে যতটুকু পারো কথা বলো ভাই, দেরি কোরো না।”

প্রবাসের রোজগার দিয়ে আমরা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাই। কিন্তু কিছু কিছু মুহূর্তে সেই রোজগারের দাম যে কত ভারী, সেটা শুধু আমরা যারা এই রাস্তায় হেঁটেছি, তারাই জানি।


আপনার জীবনেও কি এমন কোনো কষ্টের রাত এসেছে প্রবাসে? লিখে জানান — হয়তো আপনার কথাগুলো আরেকজনের বুকের ভার হালকা করবে।

এই লেখাটি কি সহায়ক হয়েছে?
Scroll to Top