Gulfzi Header - Redesign

ছয় বছর পর

বিমানটা যখন মেঘ ভেদ করে নিচে নামতে শুরু করল, করিমের বুকের ভেতর কী একটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে সে দেখছিল নিচের আলোগুলো — বুড়িগঙ্গার বাঁক, রাস্তার সারি সারি বাতি, দূরে কোথাও একটা মসজিদের মিনার। ছয় বছর আগে এই শহরটা যখন সে ছেড়ে গিয়েছিল, তখন তার বুকভরা ছিল স্বপ্ন। আজ ফিরছে, বুকভরা এক অদ্ভুত ভার নিয়ে — আনন্দ আর অপরাধবোধ একসাথে জমাট বেঁধে আছে যেন।

ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে হাত কাঁপছিল সামান্য। পাসপোর্টের পাতায় পাতায় ছয় বছরের সিল, ভিসার তারিখ, রি-এন্ট্রির স্ট্যাম্প — একটা মানুষের জীবনের এক টুকরো ইতিহাস যেন কাগজে লেখা। ব্যাগেজ বেল্টের সামনে দাঁড়িয়ে সে বারবার ঘড়ি দেখছিল, যদিও জানে বাইরে কেউ অপেক্ষা করছে, সময়ের কোনো হিসাব নেই তাদের কাছে।

কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসার সাথে সাথে ভিড়ের মধ্যে চোখ খুঁজতে লাগল পরিচিত মুখ। শত শত মানুষ, প্ল্যাকার্ড হাতে, ফুলের মালা নিয়ে — সবাই কাউকে না কাউকে খুঁজছে। তারপর হঠাৎ চোখে পড়ল মাকে। সেই একই শাড়ি, যেটা পরে মা তাকে বিদায় দিয়েছিল বিমানবন্দরে, ছয় বছর আগে। কিন্তু মুখটা বদলে গেছে — চুলে সাদা বেড়েছে অনেক, চোখের কোণে ভাঁজ গভীর হয়েছে, শরীরটা যেন একটু নুয়ে পড়েছে সময়ের ভারে।

মায়ের পাশে দাঁড়ানো এক কিশোর ছেলে, লম্বা, শুকনো, চোখে একটা অচেনা কৌতূহল। করিমের পা থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য — এই কি তার ছেলে? চার বছরের যে বাচ্চাটাকে সে কোলে নিয়ে বিমানবন্দরে বিদায় জানিয়েছিল, সেই ছেলে আজ তার কাঁধ সমান লম্বা।

“বাবা?” ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, গলায় দ্বিধা, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে ছবিতে দেখা মানুষটাই সামনে দাঁড়িয়ে আছে কিনা।

করিম আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ব্যাগ ফেলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মেঝেতে, দুই হাত বাড়িয়ে দিল। কিছু বলতে পারল না, শুধু জড়িয়ে ধরল ছেলেকে। ছেলেটার শরীর প্রথমে শক্ত হয়ে রইল, একটা অচেনা মানুষের স্পর্শে যেমন হয়, তারপর আস্তে আস্তে সেই শক্তভাব গলে গিয়ে নরম হয়ে এলো, যেন কোনো এক গভীর স্মৃতি হঠাৎ জেগে উঠছে রক্তের ভেতর। করিমের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সে হাসছিল, এমন হাসি যা কান্নার সাথে মিশে থাকে।

মা কিছু বললেন না, শুধু হাত রাখলেন করিমের মাথায়, যেভাবে ছোটবেলায় রাখতেন। সেই স্পর্শে যেন ছয় বছরের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত একাকীত্ব একসাথে গলে পড়তে চাইল।

বাড়ি ফেরার রাস্তায় গাড়িতে বসে সবাই প্রায় চুপ। জানালা দিয়ে রাস্তার চেনা দৃশ্য দেখছিল করিম — কিন্তু চেনা হয়েও কেমন অচেনা লাগছিল। নতুন দোকান উঠেছে যেখানে আগে ফাঁকা জমি ছিল, পুরনো চায়ের দোকানটা বন্ধ হয়ে গেছে, রাস্তার মোড়ের বটগাছটা কাটা পড়েছে। ছয় বছরে একটা শহর কতটা বদলে যেতে পারে, করিম যেন প্রথমবার বুঝল।

মা একবার শুধু বললেন, “রান্না করছি তোর পছন্দের ইলিশ, সরিষা দিয়ে।” গলার স্বরে এক অদ্ভুত কাঁপুনি ছিল, যেন কথাটার পেছনে আরও অনেক কথা জমে আছে বলা হয়নি।

করিম হাসল, মাথা নাড়ল। কিন্তু বুকের ভেতর একটা চাপা কষ্ট মোচড় দিয়ে উঠছিল বারবার। এই ছয় বছরে বাবা মারা গেছেন। খবরটা পেয়েছিল রাত তিনটায়, রিয়াদের একটা লেবার ক্যাম্পের রুমে, ফোনের ওপাশে মায়ের কান্না শুনে বুঝতে পেরেছিল আগেই কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে। জানাজায় থাকতে পারেনি, শেষবারের মতো বাবার মুখটা দেখতে পারেনি। সেই রাতে রুমমেটরা কেউ কিছু বলেনি, শুধু একজন এসে পাশে বসেছিল চুপচাপ, একটা হাত রেখেছিল কাঁধে। সেই নীরব সহানুভূতিটুকুই ছিল সেদিন রাতের একমাত্র সান্ত্বনা।

বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই করিম কিছুক্ষণ বসে রইল, নামার আগে। এই বাড়িটা — যার প্রতিটা ইট তার রক্ত-ঘামের টাকায় গাঁথা — আজ তার কাছে অচেনা মনে হচ্ছিল কিছুটা। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখল দেয়ালে নতুন রঙ, তার পুরনো ঘরে এখন ছেলের বইখাতা, স্কুলব্যাগ, দেয়ালে আঁকা ছবি। সে এখন যেন এই বাড়ির একজন অতিথি, যদিও এই বাড়িই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

রাতে খাবার টেবিলে বসে সবাই একসাথে ভাত খেল, অনেক বছর পর। ইলিশের গন্ধে ঘরটা ভরে উঠেছিল। ছেলে মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকাচ্ছিল বাবার দিকে, যেন এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না এই মানুষটা সত্যিই এখানে আছে।

খাওয়ার শেষে হঠাৎ ছেলে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি আবার চলে যাবা?”

করিম উত্তর দিতে পারল না সাথে সাথে। প্লেটের বাকি ভাতের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ, যেন উত্তরটা সেখানে লুকিয়ে আছে। ভিসার মেয়াদ আছে মাত্র দুই মাস। তারপর আবার সেই একই বিমানবন্দর, একই বিদায়, একই দূরত্ব। কিন্তু আজ রাতে এসব নিয়ে ভাবতে চাইল না সে।

“আরেকটু থাকি, বাবা,” বলল অবশেষে, গলা ভারী হয়ে এলো। “তারপর দেখা যাবে।”

মিথ্যা না, আবার পুরোপুরি সত্যিও না। শুধু আজ রাতটুকু সে চায় শুধু ছেলের পাশে বসে থাকতে, তার হাসি দেখতে, তার গল্প শুনতে — যতক্ষণ পারা যায়, ততক্ষণ। বাকি সব হিসাব কাল থেকে শুরু হবে।

আপনিও কি ছুটিতে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন? বিমান টিকেট বুকিং, ছুটির নিয়ম ও খরচ বাঁচানোর টিপস জানতে পড়ুন সৌদি থেকে বাংলাদেশে ছুটিতে যাওয়ার সম্পূর্ণ গাইড। পরিবারকে সৌদি আরবে নিয়ে আসতে চাইলে দেখুন ফ্যামিলি ভিজিট ভিসার সম্পূর্ণ গাইড

এই লেখাটি কি সহায়ক হয়েছে?
Scroll to Top